Bangla

আমার পথ প্রবন্ধের অনুধাবন প্রশ্নের উত্তর [অনুধাবনমূলক]

HSC বাংলা প্রথম পত্রের কাজী নজরুল ইসলাম রচিত আমার পথ প্রবন্ধের অনুধাবন প্রশ্ন এবং উত্তর নিচে প্রকাশ করা হলো।

এইচএসসি বাংলা প্রথম পত্রের একটি প্রবন্ধের নাম আমার পথ। ‘আমার পথ’ প্রবন্ধটি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত প্রবন্ধগ্রন্থ ‘রুদ্র-মঙ্গল’ থেকে সংকলিত হয়েছে। এই প্রবন্ধের অনুধাবন প্রশ্ন এবং এর উত্তর নিচে দেয়া হলো।

আমার পথ প্রবন্ধের অনুধাবন প্রশ্ন

আমার পথ প্রবন্ধে কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক আমিকে প্রকাশ করেছেন যার পথ সত্যের পথ, যিনি সত্য প্রকাশে নির্ভীক। সত্য প্রকাশে যার কোনো সংকোচ নেই। তিনি প্রতিটি মানুষকেই পরিপূর্ণ এক ‘আমি’র সীমায় ব্যাপ্ত করতে চেয়েছেন। সব মানুষ মিলে ‘আমরা’ হয়ে উঠতে চেয়েছেন।

নজরুলের এই আমি সত্তা তার পথ প্রদর্শক। তিনি নিজের সত্য ছাড়া আর কাউকে ভয় পান না। কাজী নজরুল ইসলাম মনে করেন স্পষ্ট কথা বলা কোনো অহংকার নয় বরং স্পষ্ট কথা বলার মধ্যে একটু অবিনয় থাকতেই পারে। তিনি একে গৌরবের মনে করেছেন।

আমার পথ প্রবন্ধের অনুধাবন প্রশ্ন ও উত্তর

এখানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত আমার পথ প্রবন্ধের অনুধাবন প্রশ্ন বা অনুধাবনমূলক প্রশ্ন এবং এর উত্তর নিচে দেওয়া হলো-

অনুধাবন প্রশ্ন-১: ‘আমার কর্ণধার আমি’— উক্তিটি দ্বারা প্রাবন্ধিক কী বুঝিয়েছেন?

উত্তর: ‘আমার কর্ণধার আমি’— উক্তিটি দ্বারা প্রাবন্ধিক নিজের ওপর কর্তৃত্বের গুরুত্বকে বুঝিয়েছেন। সমাজের প্রত্যেকেই একে-অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা স্বাধীন মত প্রকাশে বাধার সৃষ্টি করে। একে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে, কিন্তু নিজের ওপর কর্তৃত্ব থাকলে অনেক কাজ সহজেই করা যায়। আমার কর্ণধার আমি’- উক্তিটি দ্বারা প্রাবন্ধিক নিজের ওপর নিজের কর্তৃত্বের এ গুরুত্বকেই বুঝিয়েছেন।

অনুধাবন প্রশ্ন-২: ‘আমার পথ দেখাবে আমার সত্য’- উক্তিটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?

উত্তর: স্বীয় সভার অন্তর্গত ঐশ্বরিক শক্তিই মানুষকে সকল আবিলতা থেকে মুক্ত করে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথে ধাবিত করবে— এমন ধারণা থেকেই লেখক আলোচ্য উক্তিটি করেছেন। কর্ণধার বলতে প্রাবন্ধিক মানুষের ভেতরকার ঐশ্বরিক শক্তি বা অলৌকিক ক্ষমতাকে বুঝিয়েছেন। মানুষের মগজ ও মন স্রষ্টার পরমশক্তি জ্ঞানশক্তি ও প্রেমশক্তিতে ভরপুর। প্রাবন্ধিকের বিশ্বাস, সত্য সব অসৎ শক্তিকে পরাজিত করে মানুষকে পূর্ণতার পথে নিয়ে যায়। তাই প্রাবন্ধিকের সত্য বা ঐশী শক্তি বা সৎ শক্তি সকল প্রকার আলস্য, কর্মবিমুখতা, পঙ্গুত্ব, নৈরাজ্য, অবিশ্বাস ও জরাজীর্ণতাকে পশ্চাতে ফেলে তাকে ন্যায় ও সত্যের পথ দেখাবে।

অনুধাবন প্রশ্ন-৩: ‘কাজী নজরুল ইসলাম ‘আমার সত্য’ বলতে কী বুঝিয়েছেন?

উত্তর: কাজী নজরুল ইসলাম ‘আমার সত্য’ বলতে পরাধীনতা ও দাসত্ববৃত্তি পরিহার করে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এ দেশ একদিন ছিল শৌর্য-বীর্যের ও ঐশ্বর্যের লীলাভূমি, কিন্তু এ দেশের মানুষ তাদের আলস্য, কর্মবিমুখতা ও পৌরুষের অভাবে হয়ে পড়েছে পৃথিবীর অন্য সব দেশের চেয়ে হীন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ যদি আপন সত্যকে জানে তাহলে এখনো তাদের হারানো গৌরব ফিরে পাবে। তাই নিজ সত্তাকে জাগিয়ে তুলতেই নিজের শক্তি ও নিজের সত্যর ওপর অটুট বিশ্বাস রাখতে হবে। আর পরাধীনতা ও দাসবৃত্তি থেকে মুক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার উপায় হচ্ছে অন্তর্নিহিত সত্য।

অনুধাবন প্রশ্ন-৪: রাজভয়, লোকভয় কেন প্রাবন্ধিককে বিপথে নিয়ে যাবে না?

উত্তর: প্রাবন্ধিক তাঁর অন্তরের সত্যকে চেনেন বলে রাজভয়, লোকভয় তাঁকে বিপথে নিয়ে যাবে না। প্রাবন্ধিক মনে করেন, মানুষ যদি সত্যি করে তার আপন সত্যকে চিনে থাকে, তার অন্তরে মিথ্যার ভয় না থাকে, তাহলে বাইরের কোনো ভয়ই তার কিছু করতে পারবে না। সত্য মানুষকে পথ দেখাবে আর মিথ্যা মানুষকে ধ্বংস করবে। নিজেকে চিনলে তার মনোবলই তাকে নতুনের পথে যুদ্ধ করার শক্তি জোগাবে। এখানে রাজ্যের ভয়, রাজ্যের ভেতরের বা বাইরের কোনো শক্তিই তাকে বিপথে নিয়ে যাবে না।

অনুধাবন প্রশ্ন-৫: “যার ভেতরে ভয়, – সেই বাইরে ভয় পায়’– বুঝিয়ে লেখো।

উত্তর: যে নিজের সত্যকে চিনতে পারে না, তার ভেতরে ভয় কাজ করে বলে সে বাইরেও ভয় পায়। বাস্তবজীবনে মানুষকে প্রতিনিয়ত নানারকম সত্য-মিথ্যার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু খুব অল্প মানুষই সত্য-মিথ্যার প্রকৃত রূপ চিনতে পারে। যে সত্যকে সঠিকভাবে চিনতে পারে, তার অন্তরে মিথ্যার অমূলক ভয় থাকে না। আর যে ব্যক্তি সত্যের আসল রূপটি চিনতে ব্যর্থ হয়, তার অন্তরেই মিথ্যার ভয় থাকে। যার মনে মিথ্যা সেই মিথ্যার ভয় করে, আর অন্তরে ভয় থাকলে সে ভয় বাইরেও প্রকাশ পায়। এজন্য প্রাবন্ধিক বলেছেন, যার ভেতরে ভয় সেই বাইরে ভয় পায়।

অনুধাবন প্রশ্ন-৬: ‘যে মিথ্যাকে চেনে, সেও মিছামিছি তাকে ভয় করে না’ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: যে মিথ্যাকে চেনে, সে কখনো মিথ্যা কর্মে প্রবৃত্ত হয় না বলে সে মিথ্যাকে ভয় করে না। ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে কবি নজরুল ইসলাম এমন এক ‘আমি’র আহ্বান প্রত্যাশা করেছেন, যার পথ সত্যের পথ, সত্য প্রকাশে নির্ভীক, অসংকোচ। রুদ্র তেজে মিথ্যার ভয়কে জয় করে সত্যের আলোয় নিজেকে চিনে নিতে সাহায্য করে প্রাবন্ধিকের এই ‘আমি’ সত্তা। যে মিথ্যাকে অন্তর থেকে উপলব্ধি করে, সে কখনো মিথ্যা কাজে উৎসাহ দেখায় না, ফলে ভয়ও পায় না।

অনুধাবন প্রশ্ন-৭: ‘এটা দম্ভ নয়, অহংকার নয়।’- কথাটি ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: সত্যকে উপলব্ধি করে নিজেকে জানা দম্ভও নয়, আবার অহংকারও নয় বলে প্রাবন্ধিক মনে করেন। আত্মবিশ্বাসী লোক সবকিছু জয় করতে পারে। কারণ সে নিজের সম্পর্কে জানে বলে সেই আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তার মনে সাহস থাকে বলে সে সামনে এগিয়ে যেতে পারে। প্রাবন্ধিক মনে করেন, নিজের সম্পর্কে জানা বা সত্যকে উপলব্ধি করার এ বিষয়টা দম্ভও নয়, অহংকারও নয়।

অনুধাবন প্রশ্ন-৮: ‘ওরকম বিনয়ের চেয়ে অহংকারের পৌরুষ অনেক-অনেক ভালো’— ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: প্রশ্নোক্ত উক্তিটির মাধ্যমে লেখক মিথ্যা বিনয়ের নিরর্থকতাকে তুলে ধরেছেন। মানুষ কখনো কখনো বিনয় প্রকাশ করতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে। লেখক দেখিয়েছেন, সুস্পষ্টভাবে নিজের বিশ্বাস আর সত্যকে প্রকাশ করতে না পারলে পরনির্ভরতা তৈরি হয়। আহত হয় আমাদের ব্যক্তিত্ব। নজরুলের কাছে এই ভগ্ন আত্মবিশ্বাসের গ্লানি গ্রহণযোগ্য নয়। এর পরিবর্তে তিনি দাম্ভিক হতে রাজি আছেন। কেননা, তার বিশ্বাস সত্যের দাম্ভিকতা মিথ্যা বিনয়ের চেয়ে অনেক ভালো।

অনুধাবন প্রশ্ন-৯: কবি নিজেকে ‘অভিশাপ-রথের সারথি’ বলে অভিহিত করেছেন কেন?

উত্তর: সকল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে অভিশাপ হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন বলেই কবি নিজেকে ‘অভিশাপ-রথের সারথি’ বলে অভিহিত করেছেন। কবি পুরাতন-জীর্ণ সমাজকে ঢেলে সাজাতে চান। কিন্তু সমাজের নিয়ম পাল্টাতে গেলে বাধার সম্মুখীন হতে হয়, সমাজরক্ষকদের আক্রমণের শিকার হতে হয়। কবি এ সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তিনি তাদের অন্যায়কে অভিশাপ হয়ে ধ্বংস করতে চান। তাই তিনি নিজেকে ‘অভিশাপ-রথের সারথি’ বলে অভিহিত করেছেন।

অনুধাবন প্রশ্ন-১০: স্পষ্ট কথা বলার সময় বিনয়ভাব থাকে না কেন?

উত্তর: স্পষ্ট কথা বলায় এক ধরনের অহংকার কাজ করে বলে বিনয়ভাব তেমন থাকে না। স্পষ্ট কথা বলার সময় কোনো ফাঁক-ফোকর থাকে না বলে মনে আপনাআপনি একটা জোর এসে থাকে। এটাকে স্পর্ধা বা অহংকার বলে ভুল হলেও আসলে তা নয়। মূলত স্পষ্ট কথা বলার সময় একটা দৃঢ়তা কাজ করে বলে মানুষের মাঝে বিনয়ভাব থাকে না।

অনুধাবন প্রশ্ন-১১: স্পষ্ট কথায় কষ্ট পাওয়াকে দুর্বলতা বলা হয়েছে কেন?

উত্তর: স্পষ্ট কথায় কষ্ট পেলে অন্তর্নিহিত সত্য প্রকাশে বাধা সৃষ্টি হয় বলে এটিকে দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন লেখক। স্পষ্ট কথায় একটা অবিনয়ের ভাব থাকে, যা অনেক সময় আমাদের পীড়া দেয়। এই পীড়া সত্ত্বেও মনে রাখা দরকার, স্পষ্ট কথার মধ্য দিয়েই সত্য প্রকাশিত হয়। যারা সে সত্যকে স্বীকার করে নিতে পারে না, তারাই আহত হয় এবং প্রকারান্তরে মিথ্যাকে আঁকড়ে ধরে থাকে। সেদিক বিবেচনায় স্পষ্ট কথায় কষ্ট পাওয়াটা দুর্বলতারই নামান্তর।

অনুধাবন প্রশ্ন-১২: ‘নিজের সত্যকে নিজের কর্ণধার ভাবলে নিজের শক্তির ওপর অটুট বিশ্বাস আসে।’ লাইনটি বুঝিয়ে লেখো।

উত্তর: প্রাবন্ধিক কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে উক্ত লাইনটি দ্বারা পরাধীনতা ও দাসত্ববৃত্তি পরিহার করে স্বাবলম্বী হবার আহ্বান জানিয়েছেন। এ দেশ একদিন ছিল শৌর্য-বীর্য ও ঐশ্বর্যের লীলাভূমি, কিন্তু এ দেশের মানুষ তাদের আলস্য, কর্মবিমুখতা ও পৌরুষের অভাবে হয়ে পড়েছে পৃথিবীর অন্য সব দেশের চেয়ে হীন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ যদি আপন সত্যকে জানে তাহলে এখনো তাদের হারানো গৌরব ফিরে পাবে। তাই নিজ সত্তাকে জাগিয়ে তুলতেই নিজের শক্তির ওপর অটুট বিশ্বাস রাখতে হবে।

অনুধাবন প্রশ্ন-১৩: ‘এই পরাবলম্বনই আমাদের নিষ্ক্রিয় করে ফেলে।’ লেখক কেন এ কথা বলেছেন?

উত্তর: পরাবলম্বন মানুষের সঞ্জীবনী শক্তি ও আত্মশক্তি ক্রমান্বয়ে বিনষ্ট করে ফেলে বলে লেখক একথা বলেছেন। নিজের সত্তাকে বিকিয়ে অন্যের গলগ্রহ হয়ে থাকলে মানুষ ধীরে ধীরে অলস ও কর্মবিমুখ হয়ে পড়ে। মানুষের নিজের ভেতরে যে একটা দুর্ভেদ্য শক্তি আছে, তা বাধাপ্রাপ্ত হয়। তখন মানুষ অন্যের দানে, দয়ায় ও দাক্ষিণ্যে বেঁচে থাকে। এভাবে পরাবলম্বন আমাদের দাসত্বের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে তোলে।

অনুধাবন প্রশ্ন-১৪: ‘সবচেয়ে বড়ো দাসত্ব’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

উত্তর: ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে সবচেয়ে বড়ো দাসত্ব বলতে পরাবলম্বনকে বোঝানো হয়েছে। আত্মনির্ভরতা থেকেই স্বাধীনতা আসে। লেখকের বিশ্বাস, নিজের সত্যকে নিজের কর্ণধার মনে করলে আপন শক্তির ওপর অটুট বিশ্বাস আসে। এমন স্বাবলম্বনের কথা শেখাচ্ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। কিন্তু জনগণ মহাত্মা গান্ধীর সেই স্বাবলম্বনের কথা না বুঝে তাঁর ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। এটিই হলো পরাবলম্বন। পরাবলম্বন আত্মশক্তিকে নষ্ট করে দেয় বলে তৈরি হয় মানসিক দাসত্ব। তাই ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে পরাবলম্বনকে সবচেয়ে বড়ো দাসত্ব বলা হয়েছে।

অনুধাবন প্রশ্ন-১৫: ‘আত্মাকে চিনলেই আত্মনির্ভরতা আসে’- ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে লেখক আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে আত্ম তথা নিজের ভেতরের সত্যকে জানতে বলেছেন। ‘আমার পথ’ প্রবন্ধের লেখকের মতে, নিজেকে চিনলে মানুষের মনে আপনা-আপনিই একটা জোর আসে যে, সে আপন সত্য ছাড়া আর কারো কাছে মাথা নত করে না । অর্থাৎ কেউই তাকে ভয় দেখিয়ে পদানত করতে পারে না। মানুষের উচিত তার ভেতরের শক্তিকে উপলব্ধি করা এবং আত্মপ্রত্যয়ী হওয়া । তবেই তার নিজের ওপর নিজের বিশ্বাস জন্মাবে। প্রশ্নোক্ত উক্তিটি দ্বারা এ কথাই বোঝানো হয়েছে।

অনুধাবন প্রশ্ন-১৬: ‘সেইদিন আমরা স্বাধীন হব তার আগে কিছুতেই নয়’ – ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: যেদিন আমাদের মধ্যে আত্মনির্ভরশীলতা আসবে, সেই দিন আমরা স্বাধীন হব। তার আগে কিছুতেই নয়। যারা নিজেকে চিনতে পারে তারাই আত্মনির্ভরশীল। পরনির্ভরশীলতা মানে পরাধীনতা। আত্মনির্ভরশীল হতে হলে এই পরনির্ভরশীলতা ত্যাগ করতে হবে। যেদিন আমরা আত্মনির্ভরশীল হতে পারব, সেদিনই আমরা স্বাধীন হব। তার আগে আমরা কিছুতেই স্বাধীন বলতে পারি না।

অনুধাবন প্রশ্ন-১৭: কাজী নজরুল ইসলামের মতে, দেশের দীর্ঘদিনের পরাধীনতার কারণ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: কাজী নজরুল ইসলামের মতে, আত্মনির্ভরতার অভাবই দেশের দীর্ঘদিনের পরাধীনতার কারণ। কাজী নজরুল ইসলাম মনে করেন, আত্মাকে চিনলেই আত্মনির্ভরতা আসে। তিনি বিশ্বাস করেন, এই আত্মনির্ভরতা যেদিন সত্যি সত্যিই আমাদের আসবে, সেদিনই আমরা স্বাধীন হব। কিন্তু আমরা সেদিন নিজের প্রতি বিশ্বাস না রেখে গান্ধীজির মতো মহাপুরুষের ওপর নির্ভর করেছিলাম। ফলে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন বিলম্বিত হয়েছিল। অর্থাৎ স্পষ্টত বোঝা যায়, কাজী নজরুল ইসলাম আত্মনির্ভরতার অভাবকেই পরাধীনতার কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন।

অনুধাবন প্রশ্ন-১৮: কাজী নজরুল ইসলামের মতে, আগুনের সম্মার্জনার প্রয়োজন কেন?

উত্তর: নজরুল ইসলামের মতে, দেশ থেকে সকল অকল্যাণ দূর করার জন্য আগুনের সম্মার্জনার প্রয়োজন। প্রাবন্ধিক নিজেকে জানেন, নিজের সত্যকে জানেন । তিনি চান এই দেশকে মঙ্গলময় করে তুলতে। তিনি দেশের সকল শত্রু, মিথ্যা, মেকি, অন্যায়, ভণ্ডামি প্রভৃতি দূর করতে চান। আর তিনি বিশ্বাস করেন এসব দূর করার জন্যে প্রয়োজন আগুনের সম্মার্জনা। এ কারণেই প্রাবন্ধিক আগুনের সম্মার্জনার প্রয়োজন বোধ করেছেন ।

অনুধাবন প্রশ্ন-১৯: ‘আমি সে-দাসত্ব হতে সম্পূর্ণ মুক্ত।’ উক্তিটি ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: মিথ্যা বা ভণ্ডামিকে প্রশ্রয় করে, পরাবলম্বনের মতো দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকা প্রসঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম আলোচ্য উক্তিটি করেছেন। ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে লেখক পরাবলম্বনকে সবচেয়ে বড়ো দাসত্ব বলেছেন। নিজে নিষ্ক্রিয় থেকে অন্য একজন মহাপুরুষকে প্রাণপণে ভক্তি করলেই দেশ উদ্ধার হয়ে যাবে না, নিজের বা জাতির মুক্তি আসবে না। লেখকের মতে, যার অন্তরে গোলামির ভাব সে বাইরের গোলামি থেকে মুক্তি পায় না। লেখক ভুল করতে রাজি আছেন, কিন্তু ভণ্ডামি করতে প্রস্তুত নন। তিনি বলেছেন, তাঁর এমন কোনো গুরু নেই, যার খাতিরে তিনি কোনো সত্যের আগুন অস্বীকার করে মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেবেন । তিনি এ ধরনের দাসত্ব থেকে মুক্ত।

অনুধাবন প্রশ্ন-২০: “নিজে নিষ্ক্রিয় থেকে অন্য একজন মহাপুরুষকে প্রাণপণে ভক্তি করলেই যদি দেশ উদ্ধার হয়ে যেত, তাহলে এই দেশে এতদিন পরাধীনতা থাকত না।” ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: আলোচ্য উক্তিটিতে কবি পরাবলম্বনের মানসিকতা ত্যাগ করার কথা বলেছেন। পরাবলম্বন মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। এই দাসত্বের মনোভাব নিয়ে কোনো মহাপুরুষকে ভক্তি জানালেই দেশে স্বাধীনতা আসে না। দেশকে প্রকৃতভাবে স্বাধীন করতে হলে পরনির্ভরতা ছেড়ে আত্মনির্ভর হয়ে জনশক্তি বাড়াতে হবে। তা না হলে শত দুর্বল ব্যক্তিত্বের মানুষ নিয়ে একজন মহাপুরুষও দেশকে স্বাধীন করতে পারে না ।

অনুধাবন প্রশ্ন-২১: ‘আমার পথ’ প্রবন্ধের লেখক দাম্ভিক হতে চান কেন?

উত্তর: ‘আমার পথ’ প্রবন্ধের লেখকের কাছে মানুষের মিথ্যা আত্মবিশ্বাস গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি প্রয়োজনে দাম্ভিক হতে চান। আলোচ্য প্রবন্ধের লেখক কাজী নজরুল ইসলাম সমাজ ও সমকাল পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে দেখেছেন, সুস্পষ্টভাবে নিজের বিশ্বাস আর সত্যকে প্রকাশ করতে না জানলে তৈরি হয় পরনির্ভরতা, আহত হয়. আমাদের ব্যক্তিত্ব। নজরুলের কাছে মানুষের মিথ্যা ও সংশয়পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের গ্লানি গ্রহণযোগ্য নয়। তাই তিনি মিথ্যা আত্মবিশ্বাসের পরিবর্তে নিজ সত্যে অটল থেকে দাম্ভিক হতে চান।

অনুধাবন প্রশ্ন-২২: ‘আগুনের সম্মার্জনা’ বলতে ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে কী বোঝানো হয়েছে?

উত্তর: ‘আগুনের সম্মার্জনা’ বলতে ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে সমাজের সকল অশুদ্ধি ও ক্লেদ দূর করার হাতিয়ারকে বোঝানো হয়েছে। ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে লেখক যে সমাজের ভিত্তি পচে গেছে তাকে সমূলে উৎপাটিত করার পক্ষপাতী। তিনি পক্ষপাতী যা কিছু অশুভ, মিথ্যা, মেকি তা দূর করার । এজন্যে তাঁর মতে, প্রয়োজন আগুনের। কেননা আগুন সব রকম অশুদ্ধিকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। আগুনের সম্মার্জনা বলতে লেখক এ বিষয়টিকেই বুঝিয়েছেন।

অনুধাবন প্রশ্ন-২৩: “ভুলের মধ্য দিয়ে গিয়েই তবে সত্যকে পাওয়া যায়”— উক্তিটি বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: ভুলের মাধ্যমে মানুষ তার নিজের আত্মাকে জানতে পারে। প্রতিটি মানুষই ভুল করে। তবে লেখকের মতে ভুল করা দোষের কিছু নয়। কেননা তার মতে, সত্যকে জানতে, নিজের আত্মাকে জানার জন্য ভুল সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ভুলের মাধ্যমেই মানুষ নিজেকে চিনতে পারে এবং নিজেকে সংশোধনও করতে পারে। তাই লেখক আলোচ্য উক্তিটি করেছেন।

অনুধাবন প্রশ্ন-২৪: ‘আমার পথ’ প্রবন্ধের প্রাবন্ধিক কেন ভুল করতে রাজি আছেন?

উত্তর: ভুল স্বীকারের মাধ্যমে আত্মকে জানা যায় বলে “আমার পথ’ প্রবন্ধের প্রাবন্ধিক ভুল করতে রাজি আছেন। সত্যকে জানতে, আত্মকে জানার জন্য ভুল সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। ভুলের মাধ্যমেই কোনো ব্যক্তি নিজেকে জানতে পারে এবং নিজেকে সংশোধনও করতে পারে। কিন্তু ভুল করে যদি তা স্বীকার করা না হয়, তবে তা হয় ভণ্ডামির শামিল। প্রাবন্ধিক এরূপ ভণ্ডামি করতে রাজি নন। তাই বলা যায়, আত্মকে জানার জন্যই প্রাবন্ধিক ভুল করতে রাজি আছেন।

অনুধাবন প্রশ্ন-২৫: কাজী নজরুল ইসলাম ভুলকে প্রাণ খুলে স্বীকার করে নিতে বলেছেন কেন?

উত্তর: ভুলকে স্বীকার করে সত্যের সন্ধান পাওয়ার জন্য কাজী নজরুল ইসলাম ভূলকে প্রাণ খুলে স্বীকার করে নিতে বলেছেন। কবির মতে, ভুল সম্পর্কে অবগত থেকেও তাকে ঠিক বলে চালিয়ে দেওয়ার কপটতা ভণ্ডামির নামান্তর। ভুলের মধ্য দিয়ে গেলে তবেই সত্যকে পাওয়া যায়। ভুল করে তাকে আঁকড়ে থাকা মানে হলো মিথ্যাকে আঁকড়ে থাকা। এ কাজটি করলে সত্য অন্ধকারেই রয়ে যাবে। তাই নজরুল ভুলকে অকপটে স্বীকার করে নিতে বলেছেন।

অনুধাবন প্রশ্ন-২৬: ‘একমাত্র মিথ্যার জলই এই শিখাকে নেভাতে পারবে’- কথাটি বুঝিয়ে দাও।

উত্তর: মিথ্যা বা ভণ্ডামির সংস্পর্শে প্রকৃত সত্যের উপলব্ধি নষ্ট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বোঝাতে প্রশ্নোক্ত কথাটি বলা হয়েছে। ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে লেখক আমিত্বকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন । এজন্য প্রকৃত সত্যের উপলব্ধি থাকা জরুরি। এই উপলব্ধিকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে যদি কখনো ভুল হয়ে যায়, তখন নিঃসংকোচে তা স্বীকার করে নিতে হবে। কোনোরূপ মিথ্যা বা ভণ্ডামির আশ্রয় নেওয়া যাবে না। মিথ্যার আশ্রয় নিলে নিজের মধ্যকার প্রকৃত সত্যের বিনাশ ঘটবে। আর এটি বোঝাতেই প্রশ্নোক্ত কথাটির অবতারণা করা হয়েছে।

অনুধাবন প্রশ্ন-২৭: মানুষ-ধর্মকে সবচেয়ে বড়ো ধর্ম বলা হয় কেন?

উত্তর: মানুষ-ধর্ম তথা মনুষ্যত্ববোধই সবচেয়ে বড়ো ধর্ম। কেননা এটি জাগ্রত হলেই মানুষে মানুষে সম্প্রীতি গড়ে উঠবে। মানুষের প্রাণের সম্মিলন ঘটাতে হলে তাদের মধ্যকার ব্যবধান ঘোচাতে হবে। এ ব্যবধান ঘোচাতে হলে মানুষের ‘মানুষ’ পরিচয়টিকে সবচেয়ে ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। এর মাধ্যমে মিটে যাবে এক ধর্মের সঙ্গে অন্য ধর্মের বিরোধও। মনুষ্যত্ববোধের জাগরণই ধর্মের প্রকৃত সত্য উন্মোচন করতে পারে । তাই মানুষ-ধর্মকেই সবচেয়ে বড়ো ধর্ম বলা হয়েছে।

অনুধাবন প্রশ্ন-২৮: কাজী নজরুল ইসলাম হিন্দু-মুসলমানদের মিলনের অন্তরায় দূর করতে চেয়েছিলেন কেন?

উত্তর: মানবধর্মকে সবচেয়ে বড়ো ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করায় কাজী নজরুল ইসলাম হিন্দু-মুসলমানের মিলনের অন্তরায় দূর করতে চেয়েছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম আজীবন মানবধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর কাছে মানবধর্মই ছিল সবচেয়ে বড়ো ধর্ম। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু- মুসলমানের মিলনের অন্তরায় বা ফাঁকি কোনখানে তা দেখিয়ে দিয়ে এর গলদ দূর করা এবং দেশব্যাপী মানবধর্ম তথা সব ধর্মের মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা। আর এ কারণেই তিনি হিন্দু-মুসলমানের মিলনের অন্তরায় দূর করতে চেয়েছিলেন।

অনুধাবন প্রশ্ন-২৯: “যে নিজের ধর্মের সত্যকে চিনেছে, সে কখনো অন্য ধর্মকে ঘৃণা করতে পারে না।” ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: সুন্দরের পূজারি কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে মানবধর্মের কথা বলেছেন। ধর্মে কোনো ভেদাভেদ বা বৈষম্য নেই। পৃথিবীতে প্রত্যেক ধর্মই সত্য। শুধু ধর্মের ক্রিয়াকলাপ বা আচার-অনুষ্ঠান একেক ধর্মের একেক রকম। যে তার নিজ ধর্মের বিধি-বিধান সঠিকভাবে দিব্যজ্ঞানে চিনতে পারে, তার অন্য ধর্মের প্রতি কোনো বিদ্বেষ বা অবহেলা থাকতে পারে না। তাই নিজ ধর্মের স্বরূপ জানলে নিজ ধর্মের প্রতি বিশ্বাস স্থাপিত হয় এবং সেই-ই প্রকৃত সত্য জানতে পারে বলে তার অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা থাকে না।

আরো দেখুনঃ আমার পথ প্রবন্ধের MCQ প্রশ্নের উত্তর

এখানে এইচএসসি বাংলা ১ম পত্রের আমার পথ প্রবন্ধের মোট ২৯টি অনুধাবন প্রশ্ন বা অনুধাবনমূলক প্রশ্ন দেওয়া হলো। এখান থেকে চাইলে এর পিডিএফও ডাউনলোড করা যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button